মায়ের হাতের পাঁচতরকারির স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে: পূজা সেনগুপ্ত

দুর্গোৎসব মানেই শৈশবের দুরন্ত আনন্দ, মায়ের মিষ্টি শাসন, রান্নাঘরজুড়ে উৎসবের ঘ্রাণ আর প্রিয়জনদের নিয়ে ঘোরাঘুরি। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে অনেক কিছু, বদলেছে জীবনের ব্যস্ততা। কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে, কিছু স্বাদ মিশে থাকে আজীবন। দেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও ‘তুরঙ্গমী ডান্স থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাতা পূজা সেনগুপ্তের কাছে দুর্গাপূজা তেমনই এক আবেগের নাম—যার প্রতিটি পরতে জড়িয়ে আছে মা, শৈশব আর মায়ের হাতের রান্না।

শারদীয় আকাশে যখন উৎসবের রং লাগে, ঢাকের শব্দে যখন চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে, তখন আনন্দের পাশাপাশি কোথাও যেন উঁকি দেয় ফেলে আসা দিনের স্মৃতিও। পূজার কাছে দুর্গোৎসব কেবল দেবী আরাধনা কিংবা নতুন পোশাকে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর উপলক্ষ নয়; এটি তার শৈশবে ফিরে যাওয়ার এক মায়াবী পথ। যে পথে হাঁটলেই মনে পড়ে মায়ের মুখ, বাড়িজুড়ে উৎসবের ব্যস্ততা আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পরিচিত সব ঘ্রাণ।

সময় সংবাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এবারের দুর্গোৎসবে সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছেন পূজা সেনগুপ্ত। কথায় কথায় ফিরে গেছেন শৈশবের দিনগুলোতে। যে দিনগুলো ছিল বাধভাঙা আনন্দে ভরা, আবার ছিল মায়ের মিষ্টি শাসনের উষ্ণতাও। আজ জীবনের নানা অর্জন, কাজের ব্যস্ততা আর দেশ-বিদেশের মঞ্চে ছুটে চলার মধ্যেও সেই দিনগুলোর জন্য তার মন কেমন করে।

শৈশবের দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে থাকে। তখন উৎসব মানে ছিল না কোনো দায়িত্বের হিসাব, ছিল না সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার তাড়া। ছিল শুধু আনন্দ, অপেক্ষা আর ছুটে বেড়ানোর স্বাধীনতা। পূজার শৈশবও ছিল এমনই উচ্ছ্বাসে ভরা।

আজ সেই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে পূজার মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না। শৈশবে যেসব বিষয়কে স্বাভাবিক বলে মনে হয়, সময় পেরিয়ে গেলে সেগুলোই হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ। মায়ের শাসন, পরিবারের সান্নিধ্য, একসঙ্গে কাটানো উৎসবের দিন—সবকিছুই তখন স্মৃতির পাতায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কিছু খাবারের স্বাদ জিভে লেগে থাকে, আর কিছু খাবারের স্মৃতি থেকে যায় হৃদয়ে। মায়ের হাতের রান্না যেন এই দুইয়েরই অনন্য মেলবন্ধন। সেখানে উপকরণের পাশাপাশি মিশে থাকে যত্ন, অভ্যাস, ভালোবাসা আর একান্ত পারিবারিক মুহূর্তের গল্প।

পূজা সেনগুপ্তের স্মৃতিতেও মায়ের হাতের রান্নার কথা উঠলেই বিশেষভাবে ফিরে আসে পাঁচতরকারির স্বাদ। সেই স্বাদ আজও তার মনে গেঁথে আছে। হয়তো সময়ের সঙ্গে কত রকমের খাবারই খাওয়া হয়েছে, দেশ-বিদেশের নানা স্বাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে; কিন্তু মায়ের হাতের সেই রান্নার জায়গা আলাদা। কারণ, সেই স্বাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নিজের শৈশব, ঘরের পরিবেশ আর মায়ের স্নেহের স্মৃতি।

দুর্গাপূজার দিনগুলোতে তাদের বাড়ির রান্নার আয়োজনও ছিল বেশ সমৃদ্ধ। মায়ের হাতের সর্ষে ইলিশ, খাসির মাংস, গরম লুচি, মিষ্টি আর নাড়ু—উৎসবের খাবারের তালিকায় এসব থাকতই। রান্নাঘরজুড়ে চলত নানা পদ তৈরির ব্যস্ততা। খাবারের আয়োজন শুধু রসনাতৃপ্তির জন্য ছিল না; এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেত পরিবারের প্রতি মায়ের মমতা, অতিথিদের আপ্যায়ন আর উৎসবকে ঘিরে একসঙ্গে থাকার আনন্দ।

উৎসবের বাড়িতে অতিথিদের আসা-যাওয়া, খাবারের আয়োজন আর আড্ডার মধ্যেও পূজার ছিল নিজস্ব দায়িত্ব। মাকে সহযোগিতা করতেন তিনি। মায়ের পাশে থেকে পূজা শুধু উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেননি; ভাগ করে নিয়েছেন সংসারের কাজ, দায়িত্ব আর দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহূর্তও। মায়ের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে ওঠার এই অভিজ্ঞতা তাকে দিয়েছে এমন এক স্মৃতির ভান্ডার, যা কোনো সাফল্য কিংবা প্রাপ্তির সঙ্গে তুলনীয় নয়।

প্রিয়জনকে হারানোর পর উৎসবের আনন্দও কখনো কখনো অন্য রকম হয়ে যায়। চারপাশে আলো থাকে, মানুষের ভিড় থাকে, খাবারের আয়োজন থাকে; তবু কোথাও যেন একটি পরিচিত কণ্ঠের অভাব অনুভূত হয়। মনে পড়ে, এই সময়ে মানুষটি কী করতেন, কী রান্না করতেন, কীভাবে সবাইকে আগলে রাখতেন।

মাকে হারানোর শূন্যতা কোনো আয়োজন দিয়ে পূরণ করা যায় না। কিন্তু স্মৃতি মানুষকে এক আশ্চর্য শক্তি দেয়। পূজা আজও মাকে আবিষ্কার করেন নিজের মধ্যে। তিনি অনুভব করেন তার মা আজও তার পাশে রয়েছেন। পূজার শৈশবের দুর্গোৎসবও তেমনই এক আবেগের ভুবন, যেখানে মা আজও বেঁচে আছেন স্মৃতির আলোয়।

পূজা সেনগুপ্ত প্রতিষ্ঠিত ‘তুরঙ্গমী ডান্স থিয়েটার’ ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে নৃত্যনাট্য ও নৃত্যভিত্তিক মঞ্চপ্রযোজনার একটি নতুন ও পেশাদার ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

তার নির্দেশনায় ‘ওয়াটারনেস’, ‘নন্দিনী’, ‘অনামিকা সাগরকন্যা’ ও ‘হোচিমিন’-এর মতো প্রযোজনা দেশে-বিদেশে প্রশংসা পেয়েছে। নৃত্যকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং শিল্পভাবনা, গল্প বলা এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশের একটি শক্তিশালী ভাষা হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টায় তার কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন পূজা। ২০২২ সালে ‘হোচিমিন’ প্রযোজনার জন্য তিনি ভিয়েতনাম সরকারের সম্মানজনক ‘ফ্রেন্ডশিপ মেডেল’ অর্জন করেন। তার শিল্পীজীবনের এই অর্জন বাংলাদেশের সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিচিতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্য বহন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *